ব্রেকিং:
কুমিল্লা সমাবেশে রুমিনের মোবাইল ছিনতাই করল যুবদল কর্মী হাইমচরে নৌকার পক্ষে প্রচারণায় মাঠে ডা:টিপু ও মেয়র জুয়েল চাঁদপুর শহরের গ্রীণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আজ বিশেষ মুনাজাতের মধ্যে শেষ হচ্ছে চাঁদপুর জেলা ইজতেমা মতলব উত্তর ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ রামপুরে বিষ প্রয়োগে অসহার কৃষকের মাছ নিধন ‘গুসি শান্তি পুরস্কার’ পেলেন শিক্ষামন্ত্রী মতলবের ধনাগোদা নদীতে কচুরিপানা জটে নৌ চলাচল বন্ধ মতলবের ধনাগোদা নদীতে কচুরিপানা জটে নৌ চলাচল বন্ধ ৩৫ বছরে শৈশবের স্বাদ, হতে চান উচ্চশিক্ষিত লক্ষ্মীপুরে ছাত্রদলের ১৫১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দক্ষিণ আফ্রিকায় নোয়াখালীর ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা অটোরিকশা-মোটরসাইকেল সংঘর্ষ, প্রাণ গেল ২ তরুণের মুরাদনগরের সিদল যাচ্ছে বিদেশে ট্রেনে কাটা পড়ে নারীসহ ২ জনের মৃত্যু যোগাযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সহযোগিতা চায় আমিরাত বঙ্গবন্ধু টানেলে গাড়ি চলবে জানুয়ারিতে বিদেশিদের মন্তব্যে বিরক্ত সরকার আমনের বাম্পার ফলন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু
  • রোববার   ২৭ নভেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৩ ১৪২৯

  • || ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

টাকায়ও মেলে না প্রবাসীদের লাশ !

কুমিল্লার ধ্বনি

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২২  

কুমিল্লার তিতাস থানার শাহপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম গত ২৯ সেপ্টেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা যান। তার মরদেহ দেশে আনতে তার পরিবারের লোকজন ৩ হাজার ৫০০ রিয়েল খরচ করে বিমানের টিকিট কাটেন। বুধবার মরদেহটি ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার কথা ছিল। স্বজনরা কুমিল্লা থেকে এসে অপেক্ষা করেন মরদেহ গ্রহণ করতে। কিন্তু বিমান অবতরণ করার দীর্ঘ সময় পর বিমান কর্তৃপক্ষ জানান মরদেহটি বিমানে ওঠেনি। একই ফ্লাইটে কুমিল্লার আনোয়ারুজ্জামান নামে আরেক প্রবাসীর মরদেহ আসার কথা থাকলে তাও আসেনি। নিজ টাকায় টিকিট কেটে এই হয়রানিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মৃতের স্বজনরা। তবে কর্তৃপক্ষ তাদের সান্ত¡না দিয়ে বলেছেন ‘মিসটেক’ হয়েছে।

বর্তমানে দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকে এককভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিচ্ছে বিমান। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিমানের সেবার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিমানকে বাদ দিয়ে নতুন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট নিয়োগ দিতে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়।

বিমানের এ ধরনের হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। ২০২০ সালে নভেম্বর মাসে ওমানে মারা যান জাকির হোসেন নামে এক প্রবাসী। তার বাড়ি চাঁদপুরে। ২৭ নভেম্বর তার মরদেহ আসার কথা ছিল। কিন্তু বিমানের ফ্লাইটে মরদেহটি আসে দুদিন পর। ২০১৪ সালের জুন মাসে সৌদি আরবের জেদ্দাতে মারা যান মারুফ হোসেন নামে আরেক প্রাবাসী। কিন্তু তার মরদেহটিও যেদিন আসার কথা ছিল সেদিন আসেনি। আসে তার পরদিন।

জাহাঙ্গীর আলম ও আক্তারুজ্জামানের মরদেহ না আসার কারণ জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও যাহিদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সৌদি আরবের বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার আল-মামুন সরকার টেলিফোনে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মরদেহ দুটি বাংলাদেশে পাঠাতে বিমানের কোনো গাফিলতি হয়নি। কারণ টিকিট কাটার পর হ্যান্ডলিং এজেন্সির কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। তারা মিসটেক করেছে। আজ (গতকাল) লাশগুলো পাঠানো হয়েছে। স্বজনদের ভোগান্তি হয়েছে তা সত্য। এ জন্য আমরা দুঃখপ্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়া হবে।

মরদেহ দুটি নিতে গতকাল বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম ও আক্তারুজ্জামানের স্বজনরা। মরদেহ না পেয়ে তারা আবার চলে যান গ্রামে। স্বজনরা দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, অসাধু কর্মকর্তারা বিমানকে গিলে খাচ্ছেন। নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাড়া পরিশোধ করার পরও মরদেহটি তারা আনেননি। ঢাকা ও রিয়াদের বিমান কর্মকর্তারাও এর জবাব দিতে পারছেন না। শুধু বলেছেন, ‘মিসটেক’ হয়েছে। লাশ দুটি দ্রুত সময়ের মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিমানের মতোই রিয়াদ দূতাবাসের কতিপয় কর্মকর্তাও খারাপ আচরণ করেছেন। দুর্ব্যহারের বিষয়টি সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীকে অবহিত করবেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

সৌদি আরবে মারা যাওয়া জাহাঙ্গীর আলমের বড় ভাই আল-আমিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংসারের হাল ধরতে ১০ বছর আগে সৌদি আরব পাঠানো হয় জাহাঙ্গীরকে। মোটা বেতনে চাকরিও পেয়ে যায় জাহাঙ্গীর। যাওয়ার কয়েক মাস পর বিয়ে করে। তার স্ত্রীর নাম জান্নাত। সাড়ে ৩ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান আছে তার। বেতনের টাকা জমিয়ে রিয়াদে দোকান দেয় সে। অল্প সময়ে ব্যবসা লাভজনক হয়ে ওঠে। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকি আমরা। পরিবারে চলে আসে সচ্ছলতা। এমনকি স্ত্রী ও সন্তানকেও সৌদি আরবে নেওয়ার পরিকল্পনা করে জাহাঙ্গীর। কিন্তু স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ভেস্তে যায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে। রিয়াদ থেকে তার এক সহকর্মী ফোন করে জানায় জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সবাই আল্লাহকে ডাকেন। আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ঘণ্টাখানেক পর আবারও ফোন আসে রিয়াদ থেকে। এবার বলা হয় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে জাহাঙ্গীর চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আল আমিন আরও বলেন, পরের দিনই চলে যাই সৌদি আরব। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে যাই সহযোগিতার জন্য। দূতাবাসের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানসহ আরও কয়েকজন মিলে সহায়তার পরিবর্তে খারাপ আচরণ করেন। তাদের আচরণে মর্মাহত হয়েছি। তবে কয়েকজন প্রবাসী ভাই লাশটি আনতে সবধরনের সহায়তা করেছেন।

আল-আমিন আরও বলেন, ৩৫শ রিয়াল দিয়ে ১২ অক্টোবর বিমানের ফ্লাইটের জন্য টিকিট ক্রয় করা হয়। গতকাল সকালে রিয়াদ এয়ারপোর্টে আসার পর বিমান কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট যাবে। ৩টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে বিমানটি। আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আরেকটি লাশও একই ফ্লাইটে যাবে। কাগজপত্র চাওয়ার পর বলা হয় কোনো কাগজ লাগবে না। শুধু টিকিট দেখালেই হবে। তাদের কথায় বিশ^াস করে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইটে ঢাকায় চলে আসি। বিমান থেকে নামার পর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হয়। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার আগে বিমানের কাউন্টারে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, দুটি লাশ আসার কথা থাকলেও তা আসেনি। এই কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এরমধ্যে লাশসহ আমাকে নিতে গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজন শাহজালালে আসেন। লাশবাহী গাড়িসহ ৩টি মাইক্রোবাস ভাড়া করা হয়। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে স্বজনদের কাছে এলে তাদের আহাজারিতে নিজেকে সামলাতে পারিনি। বিশেষ করে জাহাঙ্গীরের স্ত্রীকে কিছুতেই সামলাতে পারছিলাম না। লাশ আসেনি এই কথা বলার পর আরও ভেঙে পড়েন সবাই। বিমান কর্মকর্তারা রিয়াদে যোগাযোগ করে আমাদের আশ^স্ত করেন আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় লাশটি ঢাকায় আসবে। পরে সবাই বাড়িতে চলে যাই। আজ (গতকাল) দুপুরে ভাইয়ের লাশটি নিতে ঢাকায় এসেছি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, টাকা দেওয়ার পরও বিমান কাজটি ঠিক করেনি। আর এ জন্য বিমানের আজ এই অবস্থা। প্রায় ডাবল ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটার পর হয়রানি হতে হয়েছে তা দুঃখজনক। তাছাড়া বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের আচরণের বিষয়টি রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করা হবে। সরকারের উচিত বিমানের বিষয়ে মনিটরিং করা। তাহলে বিমানের সেবার মান বাড়বে।

কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানার পড়িহলপাড়ার বাসিন্দা আনোয়ারুজ্জামান দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন। সেখানে তিনি ব্যবসা করেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বাসায়। আনোয়ারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রবাসীরা স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আনোয়ারুজ্জামানের এক আত্মীয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি যোগাযোগ করেন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে। কিন্তু দূতাবাসের লোকজন তাকে কোনো ধরনের সহায়তা করেননি। পরে তিনি রিয়াদে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস অফিসে যোগাযোগ করেন। ১২ অক্টোবর (বুধবার) ফ্লাইটের জন্য ১৩৪২ সৌদি রিয়াল (ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়) টিকিট ক্রয় করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট (বিজি-৩৪০) আসবে বলে বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেন। মরদেহটিসহ ফ্লাইট ওইদিন (বুধবার) সন্ধ্যায় অবতরণ করার কথা ছিল। গাড়ি ভাড়া করে স্বজনরাও গ্রাম থেকে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হন শাহজালাল বিমানবন্দরে। ফ্লাইট অবতরণ করলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিছুক্ষণ পর বিমান কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘মিসটেক’ হওয়াতে লাশটি ফ্লাইটে আসেনি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) আসবে। এ কথা শুনে স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নাম প্রকাশ না করে আকতারুজ্জামানের আত্মীয় ও বেবিচক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানের কীর্তিকলাপ দেখে নিজের কাছেই লজ্জা লাগছে। ভাড়ার টাকা পরিশোধ করার পরও লাশটি না আসায় সংস্থাটির সেবা হতাশাজনক। বিষয়টি বেবিচক চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হবে। কিছু কর্মকর্তার অবেহলার কারণে সংস্থাটি দিনে দিনে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এইভাবে চলতে পারে না বিমান। আমার স্বজনদের কাছে লজ্জা পাচ্ছি।

অবশেষে জাহাঙ্গীর আলমের ভাই আল আমিন জানিয়েছেন, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় মরদেহ দুটি বিমানবন্দরে পৌঁছিয়েছে। কিন্তু বিমানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে দুদিনের হয়রানি হতো না।